কোন ভাষাকে অনাদিকাল বাঁচিয়ে রাখতে হলে দরকার তার ছাপা বা মুদ্রণরূপ। যেসব ভাষা শুধুমাত্র কথাবার্তায় চলে কিন্তু লেখা হয়না সেসকল ভাষা একদিন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে ভাষাকে শক্তিশালীভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন তার সার্বজনীন ও ডিজিটাল রূপ। এটাই এখন একমাত্র রূপ যা ভবিষ্যতে সবকিছুতেই ব্যবহৃত হবে। তাই আমাদেরকে এখন এমন ফন্টে লেখালেখি করতে হবে যা হবে সার্বজনীন ও আগামীতে যেন পুনরায় পরিবর্তন করতে না হয়। তা যেন পৃথিবীর যে কোন কম্পিউটার থেকে সহজে পড়া যায়। বর্তমানে এক কম্পিউটারে লেখা ডকুমেন্ট অন্যখানে নিলে তা অনেক সময়েই পড়া যায়না। একই অবস্থা ভারতীয় বাংলা লেখা বা খবরের কাগজের ইন্টারনেট সংস্করনের ক্ষেত্রে যা বাংলাদেশ থেকে সহজে পড়া যায়না। এটার একমাত্র কারন ASCII বা ‘আসকি’-র যথেচ্ছা ব্যবহার। আসলে এর একটা প্রমিতকরণ প্রয়োজন ছিল। এসবের একমাত্র আন্তর্জাতিক সমাধান হলো ইউনিকোড ফন্ট। আসকিতে সংকেত ছিলো ২৫৬টি। আর ইউনিকোডে আছে ৬৫ হাজারেরও বেশি। এখন পর্যন্ত অনেক খবরের কাগজ ইন্টারনেটে পড়তে হলে তাদের নিজস্ব ফন্ট ইন্সটল না করে উপায় থাকেনা। তাছাড়া সব ব্রাউজার তা সাপোর্টও করেনা। তাই বাংলাদেশের অনেক সংবাদ ভিত্তিক সাইট এখন গড়ে উঠেছে ইউনিকোড ভিত্তিক ফন্ট দিয়ে। প্রথম আলো ও বাংলা ব্লগসাইট গুলোর এটি দূরদর্শিতা। এখন প্রয়োজন সংবাদ মাধ্যমগুলোসহ সরকারী সাইটগুলো বাংলা ইউনিকোডে প্রকাশ করা ও পুরোনো সমস্ত দলিল-দস্তাবেজ ইউনিকোডে রূপান্তর করা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে সবার ‘আর্কাইভ’ ব্যবহার করা খুব সহজ হবে। তাছাড়া তাদেরকেও আর্কাইভ ডেটা পরিবর্তন করার মত ঝামেলা পোহাতে হবেনা। এখন সবাই এটা মেনে নিলেই হলো।
বর্তমানে অনেকের সমস্যা হচ্ছে এসব ইউনিকোড ভিত্তিক সাইটে ঢুকে। লেখা দেখছেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা বা কখনো গোলাকৃতির। পরিত্রাণের উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। কিছু প্রযুক্তিবিদদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তা দূরীভূত হয়েছে। বর্তমানে ‘অভ্র’ ও ‘নিকশ’ সফটওয়্যার হলো তাদের মধ্যে অন্যতম। এসবের মাধ্যমে খুব সহজেই ইউনিকোডভিত্তিক ফন্ট দিয়ে লেখা যায়। আর লেখার পর তা আপলোড করলেই হলো। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার, মজিলা ফায়ারফক্স বা অপেরা ব্রাউজারে নির্দিষ্ট ওয়েব ঠিকানায় ক্লিক করলেই পৃথিবীর যেকোন প্রান্তে বাংলা ভাষায় লেখা ওয়েবসাইটটি ভেসে উঠবে। সঠিকভাবে তা দেখার জন্য সহজ তিনটি পদক্ষেপ দেওয়া হলঃ
১) ইউনিকোড ফন্ট ইন্সটলঃ
একটি ইউনিকোড ফন্ট ডাউনলোড (http://www.prothom-alo.com/fontfiles/solaiman-lipi.ttf ) করে তা কপি করে Start→Settings→Control Panel→Fonts Folder খুলে Paste করুন। দুইবার F5 Key চাপুন।
২) ভাষা সাপোর্ট যোগ করাঃ
i) Windows XP হলে icomplex 2.0 ডাউনলোড ( http://www.prothom-alo.com/fontfiles/icomplex-2.0.0.exe ) করে ডাবল ক্লিক করে ইন্সটল করুন।
ii) Windows 2000 হলে Control Panel-এ গিয়ে Regional Options এ ক্লিক করুন। তারপর General Tab বাটন থেকে Language Settings-এর নীচে Indic-এ টিক দিয়ে OK করুন।
iii) Windows 2003 হলে Control Panel-এ গিয়ে Regional and Language Options এ ক্লিক করুন। Language Tab বাটন থেকে install files for complex script and right-to-left languages (including thai) -এ টিক দিয়ে OK করুন।
ভিসতা ও উইন্ডোজ ৭-এ এসবের কিছু প্রয়োজন পড়বেনা।
৩) ব্রাউজার ইউনিকোড উপযোগী করাঃ
ইন্টারনেট এক্সপ্লোরারঃ Tools→Internet Options→Fonts→Language Script থেকে Bengali ও Web Page Font হিসেবে SolaimanLipi সিলেক্ট করে OK করুন।.
মজিলা ফায়ারফক্সঃ Tools→Options→Contents→Fonts & Colors এর নীচে Advanced ট্যাবে ক্লিক করে Fonts for থেকে Bengali সিলেক্ট করুন। তারপর Serif, Sans- serif and Monospace এর ঘরে SolamanLipi সিলেক্ট করে OK করুন।
সবশেষে ব্রাউজারের “view” menu থেকে “character encoding” হিসেবে Unicode (UTF-8) যোগ করুন।
মোবাইল ফোনে বাংলা ওয়েবসাইট দেখতে চান?
আপনার সেলফোনটি জাভা সমর্থিত হতে হবে। প্রথমেই http://mini.opera.com থেকে Opera Mini ব্রাউজারটি ডাউনলোড করে নিন। এরপর সেটি ইন্সটল করে Open করুন। Address Bar-এ লিখুন Opera:config। কনফিগার Page open হলে Use bitmap fonts for complex scripts অপশনটি খুঁজে Yes করে Save করুন। ব্যাস হয়ে গেল। এখন ইচ্ছে মত বাংলা সাইট ভ্রমণ করতে থাকুন।
ইউনিকোডে বাংলা লিখবেন কিভাবে?
“অভ্র” সফটওয়্যার-এর মাধ্যমে খুব সহজেই ইউনিকোড ভিত্তিক ফন্ট দিয়ে ইউনিবিজয় বা ফোনেটিক (ইংরেজী বানানে বাংলা লেখা) কি-বোর্ড সিলেক্ট করে বাংলা লেখা যায়। F12 key চেপে যখন খুশি বাংলা থেকে ইংরেজী এবং ইংরেজী থেকে বাংলা কি-বোর্ড পরিবর্তন করতে পারবেন। এভাবে আপনার লেখাটি নির্দিষ্ট সাইটে আপলোড করলেই হলো। কনফিগার করা সব ব্রাউজার তা সাপোর্ট করবে। “অভ্র” ডাউনলোড করতে ক্লিক করুন http://www.omicronlab.com/download/setup_avrokeyboard_4.5.1.exe
যেকোন বাংলা লেখাকে ইউনিকোডে এবং ইউনিকোড থেকে পুরানো বাংলায় কনভার্ট করুনঃ
এক্ষেত্রে চমৎকার সমাধান দিয়েছে bnwebtools। ক্লিক করুন http://bnwebtools.sourceforge.net ঠিকানায়। ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার দিয়ে ডাউনলোড করে Page-টি সেভ করে রাখুন। এই ওয়েব পেজটির সাহায্যে আপনি অফলাইনেও কাজ করতে পারেন। যেকোন বাংলা লেখাকে খুব সহজেই ইউনিকোডে কনভার্ট করতে পারবেন। প্রথমে নীচের বক্সে লেখাটি কপি করুন ও উপরের বক্সের উপরে “সামহোয়্যার-ইন” সিলেক্ট করুন। এরপরে নীচের "ইউনিকোডে বদলে উপরে নাও" বাটনটি চাপুন, আপনার ইউনিকোড টেক্সটটি পেয়ে যাবেন উপরের ইউনিকোড এডিটরে। আবার এটির সাহায্যে প্রয়োজনে ইউনিকোডকে পুরানো বাংলাতেও কনভার্ট করতে পারবেন। তার জন্যে উল্টোটা করুন।
এরই মধ্যে দেশে-বিদেশে অসংখ্য বাংলাপ্রেমী মানুষ ইউনিকোডের মাধ্যমে লিখে চলেছেন তাদের কথামালা। আর তাতে বাংলা ওয়েব সাইট, ব্লগ সাইটগুলো সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে। সম্ভব হচ্ছে মায়ের ভাষায় ই-মেইল করা, তাৎক্ষ্ণণিক বার্তা আদান-প্রদান ছাড়াও ফেসবুকে ভাব বিনিময়ের। ফলে ধীরে ধীরে কম্পিউটার ও ইন্টারনেটে বাংলা ভাষা একটি প্রমিতমানের দিকে চলতে শুরু করেছে। আমাদের প্রিয় ভাষা, কৃষ্টি আর ঐতিহ্য বেঁচে থাক আমদের হৃদয়ের মাঝে লাখ লাখ বছর ধরে। গ্লোবাল ভিলেজের দোহাই দিয়ে তাকে যেন বিসর্জন দিতে না হয়।
