Tuesday, June 30, 2009

সোয়াইন ফ্লু : প্রতিরোধই উত্তম ব্যবস্থা

বর্তমানে সারাবিশ্বে এক আতঙ্কের নাম সোয়াইন ফ্লু। যদিও আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত এ রোগে আক্রান্ত নয়জন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেলেও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে এ রোগ ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন অনেকেই। এ রোগ ছোঁয়াচে ও মারাত্মক, তবে প্রতিরোধ করতে পারলে এই রোগ অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাই সাবধানতার এখনই সময়।

সোয়াইন ফ্লু’ কি?

সোয়াইন ফ্লু প্রধানতঃ শ্বাসতন্ত্রের একটি রোগ যা টাইপ “এ” ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়। এটি মূলতঃ শূকরের হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে যে ভাইরাস এই ফ্লু সংক্রমনের পিছনে দায়ী তার সাবটাইপ H1N1 প্রজাতির। এতে যে জিন রয়েছে, সেগুলো এসেছে মানুষ, পাখি ও শুকরের ফ্লু ভাইরাস থেকে। তাই এটি তিনটি ভাইরাসের জিনের সংমিশ্রণে তৈরী একটি শক্তিশালী রূপ যা নিজেই মিউটেশনের মাধ্যমে প্রয়োজনে আবারো পরিবর্তীত নতুন রূপ সৃষ্টিতে সক্ষম।


১৯১৮ সালে স্পেন ও তৎসংলগ্ন ইউরোপে যে মহামারী ফ্লু হয়েছিল, তাতে প্রায় ৪ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৫৭ সালে এটি আবারো দেখা দেয় এবং এশিয়াতে মারা যায় প্রায় ২০ লাখ লোক। ১৯৬৮ সালে ঘটে এর প্রাদুর্ভাব যা হংকং-এ ধরা পড়ে এবং এতে মারা যায় প্রায় ১০ লাখ লোক পৃথিবীজুড়ে। ১৯৭৬ সালে আবারো এটি দেখা যায় নিউজার্সিতে। আর এবার এটা গত দুইমাস আগে ধরা পড়ে মেক্সিকোতে মিউটেশন বা পরিব্যাক্তির মাধ্যমে ভয়ংকর রূপ নিয়ে।


এখন পর্যন্ত বিশ্বের ৭০ টির বেশী দেশে সোয়াইন ফ্লু-তে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। মারা গেছে ২৬৩ জন। আক্রান্ত দেশগুলো মূলতঃ আমেরিকার সবগুলো দেশ, ইউরোপের কিছু অংশ ও এশিয়ার কিছু দেশ যেমন ভারত, চীন, জাপান ও থাইল্যান্ড। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এরোগে আক্রান্ত রোগীদের সংখ্যা ১৬।

সোয়াইন ফ্লু’র লক্ষণ কি কি?

এরোগে মূলতঃ জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি, কাশি, মাথাব্যাথা, শরীর ম্যাজম্যাজ করা, খেতে অরুচী, ক্লান্তি, গলাব্যাথা ও শেষে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সাধারনতঃ ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ৭-১০ দিনের মধ্যে উপসর্গ শুরু হয় এবং হাঁচি-কাশির মাধ্যমে একজন থেকে অপরজনে এরোগের বিস্তার ঘটে।

রোগ নির্ণয়ঃ

শ্বাসনালী, নাক বা গলা থেকে কফ বা সোয়াব নিয়ে ঢাকার রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটআইইডিসিআর) ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করতে হয়। এটা কোন জেলা বা বিভাগীয় শহরে করা যায় না। তাছাড়া সংশ্লিষ্ট ডাক্তার সাহেবরাও কিছুটা অস্বস্তির মাঝে আছেন যা খুবই স্বাভাবিক।

চিকিৎসা ও টিকাঃ

চিকিৎসা আছে, তবে এরচেয়ে প্রতিরোধ বেশী গুরুত্বপূর্ন। বর্তমানে অসিলটামিভির (ট্যামিফ্লু) নামক ওষুধ কার্যকরী ও বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ ড্রাগ পাওয়া যায়, তবে কিছুটা দামী। সকালে ও রাতে ১টি ওষুধ ৫-৭ দিন খেতে হয়। রোগ না হওয়ার জন্য প্রতিদিন ১টি করে ট্যাবলেট ৬ সপ্তাহ খেতে হয়। মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ট্যামিফ্লু ও রেলেনজা নামের দু’টি ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করলে কার্যকর ফলাফল পাওয়া যায়। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করতে হবে। মানুষের জন্য সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস প্রতিরোধে এখনো কোন টিকা আবিষ্কার হয়নি। তবে অদূর ভবিষ্যতে এর যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে H1N1 কে ঠেকানোর জন্যে।

প্রতিরোধ ও করণীয়ঃ

মুক্ত বিশ্বের এই যুগে সোয়াইন ভাইরাস দমন করা খুবই কঠিন। দেশের প্রবেশ পথগুলো যথা স্থল ও বিমান বন্দরে প্রবেশকারীদের স্ক্রিনিং ব্যবস্থাটা আরো জোরদার করতে হবে। এই ধরনের উপসর্গের রোগী পেলেই তাদেরকে আলাদা (Isolation) করে রেখে ২ সপ্তাহ পর্যন্ত পর্যবেক্ষন করতে হবে। কারন এই আলাদা করে রাখার ব্যবস্থাটায় সবচেয়ে বেশী জরুরী। কেননা আমাদের দেশে এই ভাইরাসের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো অল্প স্থানে অধিক সংখ্যক লোক বাস করার পরিবেশ। একবার এই রোগ গ্রামে-গঞ্জে বা শহরে ছড়িয়ে পড়লে তা মহামারীর আকার ধারন করবে। কোনভাবেই তা আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবেনা। তাই এধরনের সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই আপনার কাছাকাছি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সিভিল সার্জন অফিসে খবর দিন। আমাদের দেশের স্বাভাবিক নিয়মানুসারে প্রারম্ভিকভাবে বেশ তোড়জোড় দেখা গেলেও বর্তমানে স্বাস্থ্য-সেবার সাথে যুক্ত প্রশাসনিক মাধ্যমগুলোতে কিছুটা স্তিমিতভাব পরিলক্ষিত করা যাচ্ছে, যদিও সরকার যথেষ্ট সচেতন আছেন এব্যাপারে। সামান্য ঢিলেঢালা ভাব আর একটু অসচেতনতায় যথেষ্ট এ মহামারীর বিস্তার ঘটাতে দেশব্যাপী। বর্তমানে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষিত প্যানডেমিক এলার্ট ৬ পর্যায়ে আছে আন্তর্জাতিকভাবে। তাই প্রতিরোধে যা করবেন-


১) হাঁচি-কাশি লাগলে নাক-মুখে হাত না দিয়ে টিস্যু পেপার বা রুমাল চাপা দিন, যাতে তা না ছড়ায়। পরে তা ফেলে দিন বা ধুয়ে ফেলুন। হাত চাপা দিলে কব্জি পর্যন্ত ধুয়ে নিন। যত্রতত্র থু থু ফেলার অভ্যাস নিজে পরিবর্তন করুন, অন্যকেও পরিত্যাগ করতে বলুন।
২) যাদের এধরনের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, তাদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
৩) সন্দেহজনক করমর্দন এড়িয়ে চলুন। এরকম ঘটে গেলে ভালো করে হাত ধুয়ে ফেলুন।
৪) এধরনের কেউ দরজার হাতল বা অন্যকিছু ধরলে তা কড়া ডিটারজেন্ট বা সাবান দিয়ে পরিষ্কার করুন।
৫) এধরনের কারো কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা থাকলে নাক-মুখ ঢাকার মুখোশ ব্যবহার করুন।

প্রাথমিকভাবে এ রোগ সাধারন অন্য ফ্লু’র মত। তাই এসবের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপাততঃ আতংকিত হওয়ার দরকার নেই। সারাবিশ্ব এবার এর প্রতিরোধে যথেষ্ট প্রস্তুত। আমাদের দেশসহ সকল মানুষ থাকুক সুস্থ, সুন্দর ও নিরাপদ -রইলো শুভকামনা।

No comments:

Post a Comment