বর্তমানে যে কোন দেশের উন্নয়নের পূর্বশর্ত হলো তথ্যের অবাধ প্রবাহ, নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। প্রযুক্তিকে সঠিক সময় গ্রহন না করে পিছিয়ে পড়াটা এই যুগে আত্মহত্যারই শামিল। বিদ্যুৎ শক্তির অভাব বর্তমানে প্রকট আকার ধারন করেছে। এই কয়েকদিন আগেও মাননীয় অর্থমন্ত্রী সাহেব বলেছেন, আগামী তিন বছরেও চাহিদা মত বিদ্যুৎ পাওয়া বা তার কোন সমাধান হবেনা।
আমাদের দেশে বিদ্যুৎ শক্তি তৈরীর প্রধান উৎসগুলো হলো, প্রাকৃতিক গ্যাস, পানি, তেল ও কয়লা। প্রাকৃতিক গ্যাস, যার অধিকাংশই সাম্রাজ্যবাদী কিছু কোম্পানীর কাছে দায়বদ্ধ। তারা পূর্বের সরকারগুলোকে গ্যাসের মজুদ ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখিয়েছিল, শুধুমাত্র অত্যাধিক পরিমানে আহরণ, বিক্রি ও বিদেশে রপ্তানীর পরিকল্পনা করে অল্পসময়ে প্রচুর মুনাফা লাভের আশায়। আমাদের কি ক্ষতি হবে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা থাকার কথা নয়। এজন্যেই তারা কর্পোরেট ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বাপেক্সকে সুপরিকল্পিত ভাবে পঙ্গু করে রেখে।
গ্যাসের বাজার ভ্যালু কম হওয়ায় এটা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং বড় আকারে তার জন্যে প্ল্যান্ট স্থাপন করা হলো গ্যাসের ব্যবহারগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অদূরদর্শী ও অদক্ষ কাজগুলির মধ্যে অন্যতম। এখন সেইসব কয়েকশ কোটি টাকার প্ল্যান্টগুলো গ্যাসের অভাবে বাতিল হয়ে যাচ্ছে। আসলে গ্যাস নিজেই একটি শক্তি। তাকে রূপান্তর করে অন্য শক্তিতে নেওয়ার প্রয়োজন কি? গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়া মানে সারের দাম তথা চাউল সহ সকল শস্যের দাম কি পরিমান বাড়বে, সেটা কল্পনা করতেও ভয় হয়। গ্যাস শেষ হওয়া মানে হঠাৎ করে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেখা দিবে স্থবিরতা। যার আলামত আমরা ইতিমধ্যেই পেতে শুরু করেছি। এজন্যে আমাদেরকে অনেক আগেই বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নেয়া উচিত ছিল। অন্য যে উৎস্যগুলো রয়েছে তা হলো পরমাণু বিদ্যুৎ, বায়ুকলচালিত বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ ও বায়োডিজেল। পরমাণু বিদ্যুৎ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রগুলো এখনো সম্পুর্ণ সমাধান নয়। তাছাড়া সৌরবিদ্যুৎ খুবই ব্যয়বহুল ও আমাদের মতন বর্ধিষ্ণু কিন্তু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য অপর্যাপ্ত। বর্তমানে আমাদেরকে দ্রুত স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদী সমাধানের দু’টি পরিকল্পনা নিতে হবে। আমাদের সামনে ক্রমবর্ধমান বিপুল চাহিদার প্রেক্ষিতে দীর্ঘ মেয়াদী সমাধানের একটিই পথ খোলা আছে, আর তা হল পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন।
প্রশ্ন উঠতে পারে এটাতো ব্যয়বহুল এবং এত বৃহৎ ও কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ প্ল্যান্ট আমরা কি চালাতে পারবো? অবশ্যই পারবো। আমাদের ভালো ভালো সুদক্ষ প্রকৌশলীরা বিদেশে গিয়ে তাদের গবেষণা ও পেশাগত সাফল্য দেখাচ্ছে। তাতে পৃথিবীর বহুদেশের মানুষ উপকৃত হচ্ছে আমাদের মেধাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে। সুতরাং উঁচুমানের ট্রেনিং দিয়ে নিয়ে আসলে তাদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেনা। শুধু প্রয়োজন আমাদের কৃচ্ছতা সাধনের মানসিকতা তৈরী। সমস্ত সরকারী-বেসরকারী অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান আর দিবস পালনের নামে শতকোটি টাকা ব্যয় কমাতে হবে। প্যারেড গ্রাউন্ডের ওপর দিয়ে ডগ-ফাইট দেখার জন্য মিগ-২৯ বিমান কেনা বন্ধ করতে হবে।
একটি অতি প্রয়োজনীয় সেক্টরে টাকা বিনিয়োগে সমস্যা কোথায়? এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে তৃণমূল পর্যায়ে বিদ্যুৎ পৌছে দেয়ার জন্য যতদ্রুত সম্ভব পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প একান্ত জরুরী। কারন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে প্ল্যান্টের ফিজিবিলিটি টেস্ট, প্রসেস লাইসেন্সিং, ভ্যান্ডরদের মেশিনারীজ সাপ্লাই ও কমিশনিং স্টার্টআপ করতেই ৩-৪ বছর লেগে যায়। এছাড়া দেশের বৃহৎ শিল্পায়নে কোন ভোল্টেজ ফ্ল্যাকচুয়েশন ছাড়া নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পারমানবিক শক্তি অপরিহার্য। এপ্রসঙ্গে বলা যেতে পারে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে জনসংখ্যার তুলনায় রয়েছে বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও বিপুল বৈভব। যা বাংলাদেশে অনুপস্থিত ও চিত্রটা ঠিক এর উল্টো। তাই আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে পারমাণবিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে বিদ্যুত উৎপাদন বেশী জরুরী, যতটা না তাদের। খুব অল্পসময়ে তেল, গ্যাস ও পাথুরে কয়লা প্রভৃতি ফসিল জ্বালানী শেষ হয়ে যাবে। তাই আমাদের এই স্বল্প সম্পদের ব্যবহারকে করতে হবে ন্যুনতম ও সর্বোত্তম পদ্ধতিতে।
পারমানবিক বর্জ্যের কি হবে? সেটার জন্য রয়েছে কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থা যারা পারমানবিক বর্জ্য ট্রিটমেন্ট করে। আবার এটাও আশঙ্কা করা স্বাভাবিক, চেরনোবিলের মত দূর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা কতটুকু? আসলে প্রযুক্তি এই গত দু'দশকে অনেক এগিয়েছে। এখন ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়ামের ফুয়েল রডের স্থলে পিবল বেড রিএ্যাক্টর ব্যবহার করা হয় যা প্রায় একশত ভাগ নিরাপদ। তাছাড়া এটা নিয়ে আমাদের অত ভয় নেই। কেননা আমরা নিউক্লিয়ার জ্বালানী পরিশোধন বা উৎপাদনের কোন কৌশল হস্তগত করতে চাইছিনা। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে জ্বালানী ব্যবহৃত হয় তা দিয়ে কোন ভাবেই ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র বা ঐ গ্রেডের জ্বালানী প্রস্তুত সম্ভব নয়। তাই এদিক থেকে আমরা সম্পূর্ণ নিরাপদ।
আনন্দের কথা, বাংলাদেশ খুব ধীরে ধীরে হলেও পরমাণু বিদুৎ কেন্দ্র স্থাপনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর জন্যে নতুন আইন হচ্ছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু কনভেনশনে স্বাক্ষর করবে বাংলাদেশ। হবে। গত বছর জুন মাসে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়। ২০৫০ সাল পর্যন্ত ৮টি উন্নয়নশীল দেশকে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে জাতিসংঘ, তার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। বর্তমানে রাশিয়া, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন বাংলাদেশকে আর্থিক ও কারিগরী সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছে। উচ্চ পর্যায়ে কথাবার্তা চলছে, বিদ্যুৎ ঘাটতি মেটাতে ১০০০ মেগাওয়াট সম্পন্ন ২ টি পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের। প্রচলিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তুলনায় পরমানু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে দেড়গুন বেশি খরচ হয়। তবুও বর্তমানে এটি কোন কল্পনা-বিলাস নয়। বর্তমান ও ভবিষ্যতের যেকোন উন্নয়নের জন্যে এখন এটি বাস্তবতা। তর্ক-বিতর্ক থাকবেই। কিন্তু এরমধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে সোনালী ভবিষ্যতের দিকে। কিন্তু পাবনার রূপপুরের পরমাণু প্রকল্পের মত কোন অদৃশ্য হাতের কারসাজিতে এ উদ্যোগ যেন আবারো ব্যর্থ না হয়। আমাদের আশা বাংলাদেশ সফল হবে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে।

No comments:
Post a Comment